হত্যাকাণ্ডের পরে থমথমে আসাম দায় অস্বীকার আলফার: বিষ ছড়াচ্ছে বি জে পি

উজান আসামের তিনসুকিয়ায় পাঁচ গ্রামবাসীকে খুনের দায় অস্বীকার করেছে উগ্রপন্থী আলফা। বৃহস্পতিবার রাতে আততায়ীরা গ্রামবাসীদের তুলে নিয়ে গিয়ে সেতুর ওপরে বসিয়ে গুলি করে হত্যা করে। ভাষিক সংখ্যালঘু গরিব মানুষকে এভাবে খুনের ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়েছে আসামে। প্রাথমিকভাবে আলফাকেই এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী করা হলেও শুক্রবার সকালেই আলফার নেতা পরেশ বড়ুয়ার তরফে প্রচার সচিব রোমেল অসম বিবৃতি দিয়ে দাবি করেছেন, এই ঘটনার সঙ্গে সংগঠনের কোনোই যোগ নেই। তিনসুকিয়ার ঘটনার পরে থমথম করছে আসাম।


বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে সাতটা থেকে আটটার মধ্যে এই খুনের ঘটনা ঘটে তিনসুকিয়া জেলার খেরবাড়ি এলাকার বিজনীমুখ গ্রামে। আততায়ীদের গুলির মুখ থেকে বেঁচে আসা একমাত্র ব্যক্তি সহদেব নমশূদ্র (২২) শুক্রবার ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। ধলা-সদিয়া সেতু যা ভুপেন হাজারিকা সেতু নামে পরিচিত, তা থেকে মাত্র দুশ মিটার দূরে সড়কের পাশে একটি ধাবা ও হাতে গোনা কয়েকটি দোকান আছে। বৃহস্পতিবার স্থানীয় কয়েকজন ধাবায় আড্ডায় ব্যস্ত ছিলেন। কয়েকজন মিলে লুডো খেলছিলেন। হঠাৎ দুজন অপরিচিত লোক এসে তাঁদেরকে নদীর ঘাটে কিছু একটা জিনিস দেখা গেছে, তা দেখতে সবাইকে আসতে বলে। তখন সহদেব তাঁর দোকানের ঝাঁপ ফেলতে চাইলে ওই ব্যক্তিরা বাধা দেয়। বলে দোকান বন্ধ করতে হবে না। অপরিচিত লোকদের পিছু পিছু সহদেবসহ আরও পাঁচজন সেতুর মুখ অবধি যান। সেখানেই বাইকে করে আরও দুজন বন্দুকধারী আসে। এসে ছয়জনকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে একেবারে সামনে থেকে এক এক করে গুলি চালিয়ে পাঁচজনকে হত্যা করে। নিহতরা হলেন শ্যামললাল বিশ্বাস (৫০), অনন্ত বিশ্বাস(৩৫), অবিনাশ বিশ্বাস(৩০), ধনঞ্জয় নমশূদ্র (৩০) ও সুবল দাস (২৫)। প্রথম গুলির শব্দেই মাটিতে পড়ে যান সহদেব। মারা গেছেন ভেবে তাঁকে ফেলে চলে যায় আততায়ীরা। সহদেব শরীরে কোনও আঘাত পাননি কিন্তু পড়ে যাওয়ায় ও ভয়ে অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। জ্ঞান ফিরলে উঠে দেখেন পাঁচজনের লাশ পড়ে আছে। তাঁর চিৎকারে মানুষ জড়ো হয়ে স্থানীয় সদিয়া থানায় ফোন করলে প্রথমে ফোন কেটে দেন থানার ও সি। তারপর সুইচ অফ করে দেন বলে নিহতদের পরিবারের মানুষের অভিযোগ। এদিন পুলিশ অফিসাররা ঘটনাস্থলে গেলেও গ্রামবাসীরা পুলিশের ফোন না ধরার অভিযোগ জানিয়েছেন। আততায়ীরা হিন্দি ভাষায় কথা বলছিল বলে জানান সহদেব।

নিহতরা তফসিলি সম্প্রদায়ের গরিব অংশের মানুষ। সকলেই শ্রমজীবী। কারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে তা নিয়ে স্পষ্ট মন্তব্য করতে রাজি হননি পুলিশের ডি জি কুলধর সইকিয়া। ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার সন্দেহে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কাউকে আটক করা হয়নি।

তিনসুকিয়ায় বারো ঘণ্টা বন্‌ধ পালিত হয়েছে। শুক্রবার সকালে তিনসুকিয়ায় নামানো হয়েছে সেনা ও কমান্ডোবাহিনী। গোটা উজান আসামের পরিস্থিতি থমথমে হয়ে উঠেছে। ঘটনাস্থলে ৩০ রাউন্ড খালি কার্তুজ উদ্ধার হয়েছে। এগুলি একে ৪৭রাইফেলে ব্যবহৃত হয়। ক্ষোভের মুখে পড়ার ভয়ে রাজ্যের মন্ত্রী কেশব মোহন্ত, তপন গগৈ ও পরিমল শুক্লবৈদ্য বিশাল পুলিশবাহিনী নিয়ে বিকালে সদিয়া থানায় পৌঁছে নিহতদের পরিবারের একজনকে চাকরি ও পাঁচ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণের কথা ঘোষণা করে তড়িঘড়ি ফিরে এসেছেন। এদিকে মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সনোয়াল রাজ্যের বাইরে। তিনি চেন্নাইতে। ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছেন কারুর কারুর উসকানিমূলক মন্তব্যে হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। উসকানিমূলক মন্তব্য যারা করছে, তাদেরকে গ্রেপ্তার করা হয়নি কেন? এ প্রশ্নের জবাব না দিয়ে চলে যান তিনি।আরেক মন্ত্রী চন্দ্রমোহন পাটোয়ারি বলেছেন, এরকম ঘটনা ঘটতে পারে বলে সরকার আগে থেকে জানতো। ফলে বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়নি। এরকম স্ববিরোধী মন্তব্য করছেন মন্ত্রীরা।

বস্তুত, যে বাতাবরণ আসামে তৈরি করেছে বি জে পি-আর এস এস, তিনসুকিয়ার ঘটনা তারই পরিণতি বলে এদিন রাজনৈতিক মহলে জোরালো অভিযোগ উঠেছে।

এমনকি এই নির্মম হত্যাকাণ্ডকেও সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টায় নেমে পড়েছে বি জে পি। দলের বিধায়ক শিলাদিত্য দেব শুক্রবার সকালে বলেন, তিনসুকিয়ায় হত্যাকাণ্ডের পিছনে আইসিস জড়িত। দুপুরে বলেন নিহতরা বাংলাদেশী। রেল প্রতিমন্ত্রী রাজেন গোঁহাইও মৃতদের বাংলাদেশী বলে আখ্যায়িত করেছেন। এন আর সি এবং নাগরিকত্ব বিলকে সামনে রেখে সাম্প্রদায়িক প্রচার চালানো হচ্ছে। ভাষিক সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে প্রচার এবং পালটা উগ্র জাতীয়তাবাদী প্রচার উভয়েরই পিছনে বি জে পি-র নেতারা রয়েছেন। একাংশের সংগঠন উসকানি দিয়ে চলেছে। শুক্রবার সকালে আলোচনাপন্থী আলফা নেতা মৃণাল হাজারিকা ও জিতেন দত্তকে গুয়াহাটিতে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। গত সপ্তাহে এই দুজনই বাংলাভাষীদের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছিলেন।



তিনসুকিয়ায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে শুক্রবার রাজ্যের একাধিক জেলায় প্রতিবাদী মিছিল বিক্ষোভ সংঘটিত করেছে সি পি আই (এম)। গুয়াহাটিতে মিছিলে ছিলেন বরিষ্ঠ নেতা হেমেন দাস, প্রাক্তন সাংসদ উদ্ধব বর্মণ, ইশফাকুর রহমান, টিকেন দাস প্রমুখ। এছাড়া পার্টির রাজ্য সম্পাদক দেবেন ভট্টাচার্য এক বিবৃতি দিয়ে ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, তিনসুকিয়ার ঘটনায় প্রমাণ হচ্ছে রাজ্যের আইনশৃঙ্খলার পরিস্থিতির ক্রমশ অবনতি ঘটছে। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল নিয়ে রাজ্যে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। গত কিছুদিন ধরে কেউ কেউ হত্যা-হিংসার হুমকি দিচ্ছে। কিন্তু রাজ্যের বি জে পি সরকার এদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। বরং হিন্দু-মুসলমান, অসমিয়া-বাঙালির মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করতে বি জে পি নেতারা নানা প্ররোচনা দিচ্ছেন। যার ফলে নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হলো। ঘটনার উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছে পার্টি। হত্যাকারীদের শীঘ্রই গ্রেফতার করে শাস্তি দেওয়া ও নিহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে। যারা ধর্মীয় ও ভাষিক সংঘাত সৃষ্টির জন্য মন্তব্য করছে, তাদেরকেও শীঘ্রই গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়েছে সি পি আই (এম)। শান্তি ও সম্প্রীতি অটুট রেখে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সোচ্চার হতে রাজ্যবাসীর কাছে আহ্বান রেখেন ভট্টাচার্য। ঘটনার পেছনে সাম্প্রদায়িক শক্তির ষড়যন্ত্র আছে বলে অভিযোগ করেছেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ড. হীরেন গোঁহাই। শনিবার বরাক উপত্যকায় বন্‌ধ ডেকেছে একাধিক সংগঠন।

Post a Comment

0 Comments