কাজ না পাবার হতাশা নবান্নের সামনে গায়ে আগুন দিলেন যুবক

বেকারির যন্ত্রণা থেকে নবান্নের সামনে নিজেকে জ্বালিয়ে দিলেন যুবক। এখন এস এস কে এম হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে যুঝছেন বছর চল্লিশের সঞ্জয় সাহা। তাঁর বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা, স্ত্রী ও ১০মাসের এক পুত্র সন্তান আছে। 
৮১লক্ষ বেকারের কাজ দেওয়া হয়ে গেছে বলে দাবি করে নবান্ন। হিসাব মতো বুথ পিছু ১০৫জনের কাজ দেওয়া হয়ে গেছে। দুদিন আগে উত্তরবঙ্গ সফরে কোচবিহারে মুখ্যমন্ত্রী কত কাজ দিয়েছেন তার ফিরিস্তিও দিয়েছেন।
বুথের হিসাব, শতাংশের বিচার— কোনও কিছুতেই গত চার মাস ধরে আশার আলো দেখতে পায়নি সঞ্জয় সাহা। তাই বেকারির যন্ত্রণা থেকে হতাশাগ্রস্ত যুবক শুক্রবার নবান্নের মূল ফটকের সামনেই আত্মহত্যার চেষ্টা করেন।
কেন আত্মহত্যার চেষ্টা?

অবধারিতভাবে প্রশাসনের তরফ থেকে বলা হবে, যুবকের মানসিক সমস্যা ছিল। কিন্তু কেন এই সমস্যা তৈরি হলো? আসলে যুবকের কোনও কাজ ছিল না। প্রতিবেশীরা বলছেন,‘ কাজ পাচ্ছিল না। টাকা পয়সা নেই। সংসার চালাতে পারছিল না। তাই মানসিক চাপে ভুগছিল।’ আসল সমস্যা কাজ না থাকার যন্ত্রণা। দিনের পর দিন বাড়ি থেকে বেরিয়ে কাজের সন্ধানে ঘোরাফেরা করে আবার বাড়ি ফেরা। কিন্তু কাজ মেলেনি। তাই ক্রমশ হতাশ হয়ে পড়েছিলেন ওই যুবক। গত বুধবার কাজ খোঁজার নাম করে বাড়ি থেকে বের হন। কিন্তু আর বাড়ি ফেরেননি। স্ত্রী শর্মিষ্ঠা সাহা বলেন বর্তমানে কর্মহীন হয়ে পড়ার কারণে একপ্রকার মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন তাঁর স্বামী। গত বুধবার কাজ খুঁজতে উনি বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। তারপর থেকে তাঁকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার গোলাবাড়ি থানায় বাবা নিমাই সাহা নিখোঁজ ডায়েরি করেন। তারপর এদিন নবান্নের সামনে শরীরে আগুন লাগানোর ঘটনা। 
বিদ্যাসাগর সেতুর টোল প্লাজা পার হয়ে নবান্নের মূল ফটকের আগেই গায়ে কেরোসিন তেল ঢেলে নিয়েছিল যুবক। তারপর শান্ত পায়ে নিরাপত্তাকর্মীদের কোনোরকম ভাববার সুযোগ না দিয়ে এগিয়ে আসে নবান্নের মূল গেটের কাছে। কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের বক্তব্য, কাছে আসার পরই হাতের দেশলাই কাঠি ধরিয়ে নিজেকে জ্বালিয়ে দেন যুবক। কোনও কিছুর বোঝার আগেই জ্বলতে থাকেন যুবক। ঘটনার সাময়িক বিহ্বলতা কাটিয়ে নবান্নে কর্তব্যরত দমকল কর্মী, নিরাপত্তা কর্মীরা জল ছিটিয়ে আগুন নিভিয়ে দেন। গুরুতর জখম যুবককে পুলিশের অ্যাম্বুলেন্সে করে প্রথমে শিবপুরের এক বেসরকারি নার্সিং হোমে, পরে এস এস কে এম হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। শরীরের প্রায় ৭০শতাংশ পুড়ে গেছে।

দুপুর সাড়ে তিনটায় যখন নবান্নের সামনে যুবককে ঘিরে তোলপাড় প্রশাসন মুখ্যমন্ত্রী তখন ছিলেন না। তার কিছু পরেই অবশ্য উত্তরবঙ্গ থেকে ফিরে মমতা ব্যানার্জিকে দেখা গেছে গিরীশ পার্কে। কালীপুজোর উদ্বোধন মঞ্চে। যুবক যখন যন্ত্রণায় ছটফট করছেন মমতা ব্যানার্জি ব্যস্ত দীপাবলির উৎসবে।
স্ট্রেচারে দগ্ধ যুবককে তোলার সময় উপস্থিত ছিলেন এক মহিলা পুলিশকর্মী। যুবকের চেহারা দেখে তিনি নিজেই শিউড়ে উঠেছেন। বলছিলেন, অস্ফুট স্বরে কিছু বলার চেষ্টা করছিল ছেলেটি। কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল না।।
শনিবারই নয়াদিল্লিতে জড়ো হবে দেশের যুব সমাজ। নরেন্দ্র মোদী সরকারের কাছে বেকার যুবকরা জানতে চাইবেন, ‘হোয়ার ইজ মাই জব?’ কোথায় আমার কাজ? এখানকার ‘৮১লক্ষের চাকরির’ মতো দিল্লির সরকারও তো বছরে ২কোটি বেকারের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। রাত পোহালেই যখন দিল্লির রাজপথে কাজ চেয়ে হাঁটবেন যুবরা তখন এস এস কে এম হাসপাতালে যন্ত্রণায় ছটফট করবেন দগ্ধ যুবক।
গোলাবাড়ি থানার ৪৮নং ত্রিপুরা রায় লেনে যুবকের বাড়ি। দিল্লির গুরগাঁওতে একটি বেসরকারি সংস্থায় হিসাবপত্র দেখার কাজ করতেন সঞ্জয় সাহা। মায়ের অসুস্থতার জন্য গত জুলাই মাসে বাড়ি ফিরে আসেন যুবক। কিছুদিন পরে মা মারাও যান। এরপর আর দিল্লিতে না ফিরে এরাজ্যেই কাজ খুঁজতে থাকেন যুবক। কিন্তু তিন-চার মাসে কোথাও কাজ মেলেনি। বাবা নিমাই সাহার নিজস্ব গেঞ্জি তৈরির মেশিন আছে। অন্যের থেকে অর্ডার নিয়ে এসে কাজ করেন বাবা। গেঞ্জির ব্যবসায় এখন পড়তি। ফলে গোটা পরিবার সবমিলিয়ে আর্থিক সমস্যায় ছিল। বছর দুই আগে যুবকের বিয়ে হয়। ১০মাসের এক ছেলে। বাড়িতে থেকে কাজ না পেয়ে হতাশা ক্রমশ বাড়তে থাকে যুবকের। বেশ কয়েকদিন আগে বাড়িতেই একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন যুবক। এক প্রোমোটারের সঙ্গে দরজা নিয়ে দিন কয়েক আগে গোলমালে জড়িয়ে পড়েছিলেন যুবক। ওই সময় পাড়ার মধ্যে হেনস্তাও হতে হয়। তখনও একবার শরীরে কেরোসিন তেল ঢেলে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পাড়ার লোকের বাধায় শেষ পর্যন্ত তা সম্ভব হয়নি। কিন্তু এদিন নবান্নের সামনে কাজ না পাওয়া যুবক নিজেকে জ্বালিয়ে দেন।

Post a Comment

1 Comments