গ্রামের দিদির কাছে ফুটবলে হাতেখড়ি বিদ্যাসাগরের

জানেন তো আমার প্রথম কোচ ছিলেন এক মহিলা ফুটবলার?’

বছর উনিশের মণিপুরী ফুটবলারের কথাটা কিছুটা চমকে দেওয়ার মতোই। কারণ সাধারণত বিষয়টা শোনা যায় না। ১০০ জন ফুটবলারকে জিজ্ঞেস করলে প্রায় সবাই বলবেন তাঁর প্রথম কোচ একজন পুরুষ। সেখানে মণিপুরি এই তরুণ ফুটবলারের কথা অবশ্যই চমকে ওঠার মতো। পরের তথ্যটি আরও চমকপ্রদ। ‘আমার প্রথম কোচ হলেন ইরম পরমেশ্বরী দেবী। ভারতীয় জাতীয় মহিলা দলের ফুটবলার’।


ভারতীয় জাতীয় মহিলা ফুটবল দলের হয়ে পরমেশ্বরী দেবী খেলছেন ২০০৮ সাল থেকে। তাঁর বাড়ি ইম্ফল শহর থেকে ৩৭ কিমি দুরের গ্রাম সামারাম মায়াই লেইকাইয়ে। ইস্টবেঙ্গল মিডফিল্ডার বিদ্যাসাগর সিংয়েরও বাড়ি এই গ্রামেই। দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান বিদ্যাসাগরের প্রথম ফুটবল শেখা তাই ‘গ্রামের দিদি’–র কাছেই। ‘আমি যখন দিদির কাছে ফুটবল শিখতাম, অনেকসময় ছেলে আর মেয়েরা একসঙ্গেই অনুশীলন করতাম’ বলছিলেন বিদ্যাসাগর। বিদ্যাসাগরের প্রথম ক্লাব ট্রাউ এফসি। ইম্ফলে তাঁকে ট্রায়ালে দেখে ইস্টবেঙ্গল আকাদেমিতে নিয়ে আসেন, আকাদেমির কোচ রঞ্জন চৌধুরি। ইস্টবেঙ্গল যুব দলের হয়ে অনেকগুলো গোল করেছেন বিদ্যাসাগর।


দুরন্ত গতি এবং সঙ্গে গোল করার ক্ষমতা। গত বছরই তাঁকে সিনিয়র দলে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সুযোগ পাননি। এবছর সন্তোষেই প্রথম নিজের জাত চেনান। চারটি গোল করেন তিনি। ‘সন্তোষে খেলা আমার টার্নিং পয়েন্ট। আমি ধন্যবাদ জানাই সন্তোষে আমাদের কোচ রঞ্জন চৌধুরিকে (ইস্টবেঙ্গলের সহকারী কোচ)’ বলছিলেন বিদ্যাসাগর। কলকাতা লিগেও ভালো খেলেন এই তরুণ ফুটবলার। আলেজান্দ্রো আসার পর তাঁর বেশ নজরে পড়েন। প্রতি ম্যাচেই তাঁকে পরিবর্ত হিসাবে ব্যবহার করছেন আলেজান্দ্রো। লাজঙ ম্যাচে পরে নেমে গোলও করেন। ‘কোচ আমাকে সব সময় ভুল শুধরে দেন, আমার পাশে থাকেন। জুনিয়র ফুটবলার হয়েও আমকে চাপ নিতে হয় না’ বলছিলেন বিদ্যাসাগর। তবে চেন্নাই ম্যাচে শেষের দিকে অনভিজ্ঞতার পরিচয় দেন বিদ্যাসাগর। দুপাশে দুই ইস্টবেঙ্গল ফুটবলার থাকা সত্ত্বেও তিনি সরাসরি শট নেন। সেই বলটি প্রতিহত হয়। কাউন্টার অ্যাটাকে পেনাল্টি হয়। ভুল মানছেন বিদ্যাসাগর। ‘আমি জানি আমি যদি বলটা পাস দিতাম, তহলে হয়ত ম্যাচের ফল অন্যরকম হতো। আমার উন্নতির জন্য এখনও অনেকটা অভিজ্ঞতা প্রয়োজন’ বলছিলেন বিদ্যাসাগর। তাঁর আক্ষেপ প্রথম ম্যাচে ইম্ফলে মাঠে আসতে পারেননি তাঁর পরিবার। ‘আমার দাদু তখন হাসপাতালে ছিল, তাই বাড়ির কেউ খেলা দেখতে ইম্ফলে আসতে পারেননি’


মণিপুরের বাকি ফুটবলারদের মতো তাঁর ভাষা সমস্যা নেই। ইংরেজিটা ভালোই বলেন। ‘আসলে বেশিরভাগ ফুটবলারই খুব গরিব ঘর থেকে উঠে আসে। পড়াশুনোর সুযোগটা পায় না। আমার পড়াশুনোর প্রতি গভীর ভালোবাসা আছে। ইস্টবেঙ্গল আকাদেমিতে আসার আগেই উচ্চমাধ্যমিক পাশ করি। পরেও আরও পড়াশুনো করার ইচ্ছা আছে’। আর ‘ভাই’য়ের সাফল্যে কি বলছেন জাতীয় দলের প্রাক্তন ফুটবলার পরমেশ্বরী দেবী। ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে বললেন, ‘আমি খুব গর্বিত ওর জন্য। খেলতে তো তখন অনেকেই আসতো। ও খেলাটাকে ভালোবাসতো। সকাল এবং বিকালে আমি অনুশীলনে নামলেই চলে আসতো। খুব অল্প সময়ে ও ইস্টবেঙ্গলের প্রথম একাদশে জায়গা করে নেবে।’ ইস্টবেঙ্গল আকাদেমির কোচ রঞ্জন চৌধুরির হাত ধরে ভারতীয় ফুটবলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন বহু ফুটবলার। তিনিও বেশ আশাবাদী বিদ্যাসাগরের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

Post a Comment

0 Comments