মুখ্যমন্ত্রীর লক্ষ টাকার উড়ানই সার, ক্ষুধার্ত সবরের ঘরে ত্রাণ পৌঁছে দিলেন মহিলা, ছাত্র, যুবরা

কাপগাড়ি থেকে তেরো কিমি পথ পেরোতে মুখ্যমন্ত্রী চড়েছেন হেলিকপ্টারে। সোমবার। সেদিনই কয়েক লক্ষ টাকা খরচ করে তাঁর প্রশাসনিক সভার আয়োজন করা হয়েছিল ঝাড়গ্রামে। যথারীতি ছড়াছড়ি ছিল দামি খাবারের প্যাকেটের।
কিন্তু পূর্ণাপানির ক্ষুধার্ত শবরদের খাবারের জন্য সেই ‘মা-মাটি-মানুষের’ সরকারের অবদান কী? এখনও একটি টাকাও বরাদ্দ করেনি প্রশাসন পূর্ণাপানির বিপর্যস্ত পরিবারগুলির জন্য।



বিনপুর-১নং ব্লকের বি ডি ও মহম্মদ ফাইজান আশরাফ সরকারকে আড়াল করতে মঙ্গলবার বলেছেন, ‘‘এখনও দেয়নি। দেবে। স্বনির্ভর গোষ্ঠী বিল দিলে টাকা দেবে জেলা।’’ পূর্ণাপানির শবরদের জন্য রান্না করছেন যে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা, তাঁদের দুজন মঙ্গলবার বললেন, ‘‘জানি না কতদিন চালাতে পারব। মিড ডে মিল থেকে চাল পাওয়া যাচ্ছে। কতদিন পাওয়া যাবে, কে জানে? আমাদেরও তো টাকা জোগাড় করতে অবস্থা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।’’ বি ডি ও অবশ্য দাবি করেছেন এর সঙ্গে মিড ডে মিলের কোনও সম্পর্ক নেই।
কিন্তু কতদিন এভাবে চলবে? জবাব দেওয়ার কথা ‘জেলার মুখ্যমন্ত্রীর’। কিন্তু সভাধিপতি মাধবী বিশ্বাস মঙ্গলবার অত্যন্ত স্বাভাবিক স্বরে বললেন, ‘‘আমি জানি না কিছু। ডি এম, বি ডি ও বলতে পারবেন। কতদিন চালাবে ওনারা জানেন।’’ পূর্ণাপানিতে অনেক খাবার, পোশাক, গরম জামার মত সহায়তা নিয়ে মঙ্গলবার গেছিল সারা ভারত গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির এগারোজনের এক প্রতিনিধি দল। তাঁদের পক্ষ থেকে সংগঠনের সভানেত্রী অঞ্জু কর এবং সম্পাদিকা কনীনিকা ঘোষ এদিন মিড ডে মিলের এই ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, ‘‘মিড ডে মিলের খাবার দিয়ে রান্না করা হচ্ছে। অথচ প্রশাসন এখনও কোনও টাকা বরাদ্দ করেনি। যে গোষ্ঠী রান্না করছে, তারা কোনও টাকা পাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। আমরা এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ করছি।’’
মুখ্যমন্ত্রীর জঙ্গলমহলের উড়ান সফরের পরে কংসাবতীর বুক থেকে কয়েক শো টন বালি ইতিমধ্যেই তোলা হয়ে গেছে। কিন্তু পূর্ণাপানি যেখানে ছিল সেখানেই আছে।
কেমন?
‘আমি বিশ্বাস করি না এখনও কেউ অনাহারে মারা গেছে। ভাতের কোনও অভাব নেই।’ বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি। সোমবার দুপুরে। জামবনীর কাপগাড়িতে।
তাঁর দাবির পরে চব্বিশ ঘন্টা পেরোয়নি। পূর্ণাপানির প্যারাটিচার অনেক কষ্টে এসে দাঁড়িয়েছিলেন জঙ্গলখাসের মুখে। কেন? অন্তঃসত্ত্বা মহিলা বললেন, ‘‘সব ছেলেপিলে চলে এসেছে স্কুল ছেড়ে। আমাকে তাই আসতে হলো।’’
সব ছাত্র ছুটে চলে এসেছে কেন?
মহিলা সমিতি ছাড়াও মঙ্গলবার ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের প্রতিনিধিরা চাল, আলু, কপি-শিমের মত নানা সব্‌জি, শুকনো খাবার, কম্বলসহ একটি ছোট ম্যাটাডোর বোঝাই নানা ত্রাণ নিয়ে সেই গ্রামে পৌঁছেছিলেন। শবর পরিবারগুলিকে ‘বাইরের লোকের’ কাছে কথা বলতে বারণ করে দিয়েছে স্থানীয় তৃণমূল কংগ্রেসের কর্মীরা। কিন্তু বাড়িতে যখন অভাব, তখন নির্বাক থাকার নির্দেশ উড়ে যায় শুকনো শালপাতার মত।
তাই আঁচল কিংবা বাড়ির বিবর্ণ কুলো পেতে খাবারের সামগ্রী নিতে নিতে অঞ্জনা শবরের কথার সঙ্গে গলা মিলিয়ে শবর রমনীরা প্রতিনিধি দল দুটিকে জানিয়েছেন, ‘‘এখন যে খাবার দিচ্ছে তার ভাতগুলি তবু খাওয়া যায়। কিন্তু রেশনের চাল বেশিরভাগ সময়ে খাওয়া যায় না। পুকা (পোকা) থাকে।’’ মহিলা সমিতির প্রতিনিধিরা সেই চালের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। পূর্ণাপানির শবর গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলার ফাঁকে ডি ওয়াই এফ আই-র সাধারণ সম্পাদক অভয় মুখার্জি, রাজ্য সভাপতি মীনাক্ষী মুখার্জি এবং সম্পাদক সায়নদীপ মিত্রর প্রতিক্রিয়া, ‘‘কাজের কোনও নিশ্চয়তা নেই। মাঠে যেটুকু কাজ তাতে মজুরি ১০০-১২০ টাকা। এতজন মারা গেলেন। প্রশাসনের কোনও উদ্যোগই দেখা যাচ্ছে না। এ’ কোথায় নিয়ে যাচ্ছে রাজ্যের সরকারটা?’’
প্রশাসনিক বৈঠকে মুখ্যমন্ত্রী সোমবার ক্লাস্টার গড়ার প্রতিশ্রুতি শুনিয়েছেন। প্রশাসনের কর্তারা আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে নানা পরিকল্পনাও শুনিয়ে দিয়েছেন মমতা ব্যানার্জিকে। কিন্তু এখন লালগড় পঞ্চায়েতে একশো দিনের প্রকল্পে গড় কাজের দিন কত? ২৩। পাশের ধরমপুর পঞ্চায়েতে তা ১৮ দিন। আর লালগড় পঞ্চায়েতের অন্তর্গত পূর্ণাপানিতে রেগার কাজ শবরদের মৃত্যুর আগেও বন্ধ ছিল। এখনও বন্ধ!
‘‘মুখ্যমন্ত্রী আর জেলাশাসকের পরিকল্পনা পূর্ণাপানি খাবে না মাথায় মাখবে?’’ পূর্ণাপানিতে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্ন বিধায়ক ইব্রাহিম আলি, ঝাড়গ্রাম এবং পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার যুব নেতা স্বপন ফৌজদার, বিশ্বরঞ্জন খামরুই, রঞ্জিত পালদের। তাঁদের পাশে দাঁড়িয়ে পূর্ণাপানির অন্য মৌজার বাসিন্দা বৃদ্ধ বৃহস্পতি মাহাতো, যুবক গিরিধারী লোহাররাও সেই কথার সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে ফেললেন।
দুটি সংগঠনের নেতৃত্ব শবর পরিবারগুলিকে কাছে ডেকে কথা বলেছেন। সবাই মুখ খুলেছেন। অভাবের কথা —  তা সে কাজেরই হোক কিংবা খাবারের, নিঃসঙ্কোচে জানিয়েছে। দেখা গেল আত্মমুখী থাকতে অভ্যস্ত যে শববরা, তাঁদের বাড়ির মহিলারা, শিশুরা কিংবা পুরুষরা এগিয়ে এসেছেন। সহায়তা গ্রহণ করেছেন।
আর প্রতিনিধি দল যখন গ্রামে ত্রাণ দিচ্ছেন, কথা বলছেন, তখন স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা সেদিনের রান্না করতে কাছের মাঠে উপস্থিত হয়েছেন। ঘড়িতে তখন প্রায় পৌনে দুটো। তখন রান্না হবে? তারপর খাবার বিলি হবে? তখনই স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলারা তাঁদের অসুবিধার কথা জানিয়েছেন।
খাবারের অভাব না থাকলে প্রশাসন কেন খাবারের ব্যবস্থা করছে? সংগঠনগুলির সহায়তা গ্রহণের জন্য নিজেদের সঙ্কোচের আজন্মলালিত অভ্যাসই বা কেন পরিত্যাগ করতে পারছে শবর পরিবারগুলি?
এদিনও বিশু শবর, চুনা শবররা জানিয়েছেন যে, তাঁদের খাবারের অভাব আছে। অসুবিধা আছে পানীয় জলের। কাজের সমস্যা মারাত্মক। সন্টু শবর জানালেন,‘‘আমি বুড়া হয়েছি। আমার ভাতাটুকুর পর্যন্ত ব্যবস্থা করে নাই। চাইতে গেলে বলে আগে পাঁচশো-হাজার টাকা দাও। এভাবে বাঁচা যাবে?’’ মহিলা সমিতির প্রতিনিধি দলের সদস্য রেখা গোস্বামী, মিনতি ঘোষ, রূপা বাগচী, যুব নেতা শতরূপ ঘোষ, অভিজিৎ অধিকারী, ঝটিকা বিশ্বাস প্রমুখ গ্রামবাসীদের নানা অসুবিধার বিষয়ে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছেন।
পূর্ণাপানিতে যাওয়া মহিলা সমিতির প্রতিনিধি দলে আরও যাঁরা ছিলেন, তাঁরা হলেন সোমা দাস, দিপু দাস, স্বপ্না ভট্টাচার্য, আত্রেয়ী গুহ, যূথিকা মাহাতো, পিরিল মুর্মূ। যুবদের প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন অভিজিৎ অধিকারী, হিমঘ্নরাজ ভট্টাচার্য, শ্যামল মাহাতো, এস এফ আই নেত্রী তনুশ্রী মণ্ডল প্রমুখ।

Post a Comment

0 Comments