লুট-দুর্নীতিতে মোদী, মমতা একই পথে, যাদবপুরে শ্রমিক সমাবেশে সূর্য মিশ্র

আগামী মার্চ মাসের মধ্যে এ টি এম-এর সংখ্যা অর্ধেক হয়ে যাবে। শুধু তা নয়, ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণের পথে মোদী সরকার অর্ধেক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কও বন্ধ করে দেবে। শুধু শ্রমজীবী মানুষই নন, সাধারণ মানুষও চরম সংকটে পড়বেন। শুক্রবার যাদবপুরে সুকান্ত সেতুর মুখে সি আই টি ইউ-র ডাকে অনুষ্ঠিত শ্রমিক সমাবেশে এ কথা বললেন গণআন্দোলনের নেতা সূর্য মিশ্র।


সেতুর মুখে রাস্তার উপরে এই বিরাট সমাবেশে সূর্য মিশ্র বললেন, ‘‘আসার পথেই শুনলাম, যারা লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা দেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পালিয়ে গিয়েছেন, তাদের ঋণ মকুব করবে কেন্দ্রের মোদী সরকার। নীরব মোদী, ললিত মোদী, বিজয় মালিয়াদের যাবতীয় অপরাধ মকুব করে দেবে এই জনবিরোধী সরকার। দেশের প্রধানমন্ত্রী এখন রিজার্ভ ব্যাঙ্কে হাত বসাচ্ছেন। এই জনবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে খেটে খাওয়া মানুষের লড়াই শুধু আজকের সভায় নয়, আগামী ৮ই, ৯ই জানুয়ারি দেশজোড়া ধর্মঘটের পথেও।’’


সি আই টি ইউ দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার দশম সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশ ছিল এদিন যাদবপুরে। কমরেড সুকোমল সেন নগরে (যাদবপুরে) কমরেড মহম্মদ আমিন মঞ্চে (সন্তোষপুরে) শনিবার শুরু হচ্ছে দুই দিনের জেলা সম্মেলন।
এ দিন সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশে সূর্য মিশ্র বললেন, যারা দেশ এবং রাজ্য চালাচ্ছে, তারা জনগণের উপর লুটের রাজত্বের প্রতিনিধিত্ব করছে। তারা পুঁজিপতিদের প্রতিনিধিত্ব করে। এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে কোনও দিন রাজ্যের কৃষকদের স্বার্থের কথা, রাজ্যের শ্রমিকদের স্বার্থের কথা বলতে শুনেছেন? তিনি বললেন, এই মুহূর্তে মহারাষ্ট্রের বুকে পথ হাঁটছেন ৪০-৫০ হাজার কিষান, খেতমজুর। এ রাজ্যেও হুগলীর সিঙ্গুর থেকে কৃষক, খেতমজুররা পায়ে হেঁটে কলকাতায় আসবেন আগামী ২৮-২৯শে নভেম্বর। সিঙ্গুরের কৃষকরা দাবি তুলছেন, শিল্প চাই। সিঙ্গুরে চাই, গোটা রাজ্যে শিল্প চাই। আর বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর সরকার জানিয়েছে, ৯৫৫ একর জমিই না কি কৃষকদের হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়ে গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরে গিয়ে সরষে বীজ ছড়িয়েছিলেন। সেই জমিতে এখন ওদের কথায় ধান হয়েছে। আসলে ওখানে চাষ করতে গিয়ে লাঙলের ফলাই ভেঙে গিয়েছে।


শুক্রবার এই প্রকাশ্য সমাবেশে এছাড়াও বক্তব্য রেখেছেন বিধানসভার বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী, সি আই টি ইউ পশ্চিমবঙ্গ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অনাদি সাহু, সংগঠনের জেলার সাধারণ সম্পাদক রতন বাগচী। সভাপতিত্ব করেছেন সি আই টি ইউ জেলা সভাপতি অলোক সর্দার।
এই সমাবেশে সূর্য মিশ্র বললেন, শুধু মোদী নন, এ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জিও কর্পোরেট স্বার্থ নিয়েই রাজ্য চালান। কর্পোরেটদের সঙ্গে গোপন সমঝোতার ফলই হলো, গত ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মুখ্যমন্ত্রীর আকাশে ওড়ার জন্য যে ৪টি হেলিকপ্টার তৈরি ছিল, সেগুলির মালিক আম্বানি। মিশ্র বললেন, প্রধানমন্ত্রী মুখেই দুই কোটি বেকারকে চাকরি দিয়েছেন। আর ইনিও (রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী) বলে দিয়েছেন, প্রায় এক কোটি বেকারকে চাকরি দিয়েছেন। আর বাস্তব চিত্র হলো, সি এম আই ই রিপোর্ট বলছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর, এই এক বছরে এক কোটি শ্রমজীবীর সংখ্যা কমে গিয়েছে। রুটিরুজির এমন চরম সংকট যখন, তখন আক্রান্ত মানুষকে ভাগাভাগির খেলায় ‘যাত্রা’ শুরু হচ্ছে। রথ নয়, আসলে ভোট যাত্রা শুরু হচ্ছে। শুধু কর্পোরেটদের লুটের নীতিতে নয়, দুর্নীতিতেও কেন্দ্র ও রাজ্যের শাসক একই পথের পথিক। দেশের চৌকিদার চোর, আর এ রাজ্যের দফাদারও চোর। এর মোকাবিলায় খেটে খাওয়া মানুষের লড়াই দেশ, জাত, ধর্ম, গায়ের রঙের ভেদ মানে না। একটাই ঝান্ডা রয়েছে, যা বিশ্বের সব দেশে দেখতে পাওয়া যায়। একটাই শ্রমিকশ্রেণি, যা বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে শাসকের চোখে চোখ রেখে লড়াই করে।


শুক্রবার এই শ্রমিক সমাবেশে বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বললেন, গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে দেশের প্রধানমন্ত্রী এ রাজ্যে এসে বলেছিলেন, চিট ফান্ডের টাকা কোথায় রাখা আছে, তিনি জানেন। তাঁকে ভোট দিলে ফেরত আনবেন সেই টাকা। প্রতারিতদের তা ফেরত দেওয়া হবে। কোথায় সেই প্রতিশ্রুতি? গোটা দেশের মানুষ যখন কেন্দ্রের মোদী সরকারকে টিয়ে দিতে লড়াই-আন্দোলনে শামিল, তখন সেই পথ আগলে দাঁড়াচ্ছে এ রাজ্যের শাসক তৃণমূল সরকার। আগামী ৮ ও ৯ই জানুয়ারি দেশজোড়া ধর্মঘটের বিপক্ষে মাত্র দুই শক্তি। কেন্দ্রের শাসক বি জে পি এবং এ রাজ্যের শাসক তৃণমূল। ওদের দুর্নীতি ব্যাপম তো এদের দুর্নীতি টেট। এমন দুর্নীতিতে টাকা লুটে বেআইনি সম্পদের পাহাড় বানিয়েছে এই শাসক তৃণমূল। কলকাতা কর্পোরেশনে মেয়র পদ নিয়ে নাটকও সেই লুটের রাজনীতির ফসল।


এ দিন অনাদি সাহু বলেন, ধর্মঘটের অধিকার শ্রমিকশ্রেণির অর্জিত অধিকার। মমতা ব্যানার্জির সরকার সেই অধিকার কেড়ে নিতে পারবে না। ধর্মঘটের দিন রাস্তায় থাকবেন শ্রমজীবীরা। ব্যারিকেড থাকবে শ্রমিক-কর্মচারী ও সাধারণ মানুষের। এদিন সি আই টি ইউ জেলা সম্পাদক রতন বাগচী বলেছেন, শনিবার থেকে যে ৩৭০ জন প্রতিনিধি সম্মেলনে হাজির হচ্ছেন, তাঁদের কেউ বাসের শ্রমিক, যাঁকে লালঝান্ডা ধরার ‘অপরাধ’-এ কাজ থেকে বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কেউ বা মিড ডে মিলের শ্রমজীবী, আবার কেউ জুটমিলের ঠিকা শ্রমিক।

Post a Comment

0 Comments