২৯শে কলকাতায় আসছেন ৫০হাজার কৃষক-খেতমজুর

সিঙ্গুর থেকে রাজভবন অভিযানে সব মিলিয়ে প্রায় ৫০হাজার কৃষক এবং খেতমজুর অংশগ্রহণ করবেন বলে জানালেন নেতৃবৃন্দ। কৃষক ও খেতমজুর আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ বলেছেন, সিঙ্গুরে কৃষকদরদী সেজে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি তৈরি হয়ে যাওয়া গাড়ি কারখানা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। এবার তাঁর মুখোশ খুলে দেওয়া হবে সিঙ্গুর আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। কৃষক ও খেতমজুরদের দাবিতে এবং কর্মসংস্থানের জন্য সিঙ্গুর-সহ সারা রাজ্যে শিল্পায়নের দাবিতে সিঙ্গুর থেকে রাজভবন অভিযান করা হবে আগামী ২৮থেকে ২৯শে নভেম্বর। দ্বিতীয় দিন কলকাতায় রানী রাসমণি রোডের সমাবেশে প্রায় ৫০হাজার কৃষক-খেতমজুর জমায়েত হবেন।

সিঙ্গুর থেকে রাজভবন অভিযানের কর্মসূচী সম্পর্কে এদিন একটি সাংবাদিক বৈঠক করেন পশ্চিমবঙ্গ প্রাদেশিক কৃষকসভার সম্পাদক অমল হালদার, সারা ভারত খেতমজুর ইউনিয়নের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সম্পাদক অমিয় পাত্র এবং সভাপতি তুষার ঘোষ। অমল হালদার জানিয়েছেন, ২৮শে নভেম্বর বেলা ১১টায় সিঙ্গুরের রতনপুর মোড় থেকে পদযাত্রা শুরু হবে। উদ্বোধন করবেন সারা ভারত কৃষকসভার সাধারণ সম্পাদক হান্নান মোল্লা। বিভিন্ন জেলা থেকে মোট ১০হাজার পদযাত্রী সিঙ্গুর থেকে হাঁটা শুরু করবেন কলকাতার উদ্দেশে। দিনের শেষে হাওড়ার বালিতে পদযাত্রীদের বিশ্রাম। ২৫০০স্থায়ী পদযাত্রীর রাত্রিবাসের জন্য বালি ও সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় বাড়িতে বাড়িতে ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ঘরে ঘরে থাকবেন তাঁরা। পদযাত্রীদের টিফিনের জন্যও হাওড়ার কৃষকসভার কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে খাবার সংগ্রহ করবেন। পরদিন বেলা ১১টায় বালিঘাট থেকে ফের পদযাত্রা শুরু হবে। ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষা আছে, তাদের পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌছতে যাতে অসুবিধা না হয় তার জন্য সকাল ৯টার পরিবর্তে ১১টায় পদযাত্রা শুরু হবে। ১৬হাজার কৃষক ও খেতমজুর ঐদিনের পদযাত্রায় অংশ নেবেন বালিঘাট থেকে। এরপরে পদযাত্রা হাওড়ায় এলে সেখানে দুই মেদিনীপুর এবং অন্যান্য জায়গার আরো পদযাত্রী যুক্ত হবেন। সব মিলিয়ে ৩৭হাজার মানুষ হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে কলকাতায় প্রবেশ করবেন। দুপুর ২টোয় তাঁরা রানী রাসমণি রোডে পৌঁছবেন। অন্যদিকে শিয়ালদহ স্টেশন থেকে উত্তর ও দক্ষিণ ২৪পরগনা, নদীয়ার ১২হাজার মানুষ মিছিল করে রানী রাসমণি রোডের জমায়েতে আসবেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৫০হাজার মানুষের সমাবেশ হবে সেখানে।

রানী রাসমণি রোডের সমাবেশে সূর্য মিশ্র, অমিয় পাত্র, অমল হালদার, তুষার ঘোষ ভাষণ দেবেন। সভাপতিত্ব করবেন নৃপেন চৌধুরী। এদিন অমিয় পাত্র সাংবাদিকদের বলেন, মুখ্যমন্ত্রী অনেকদিন সময় পেয়েছেন। কিন্তু তিনি কৃষকদের সমস্যার সমাধানও করতে পারেননি, বিদেশ ভ্রমণ করেছেন কিন্তু শিল্পে বিনিয়োগও আনতে পারেননি। সিঙ্গুর নিয়ে তিনি যে কৃষকদরদী সেজেছিলেন এবার সেই মুখোশ আমরা ছিঁড়ে ফেলতে চাই। গত চার বছরে রাজ্যে ৫৭হাজার একর চাষযোগ্য জমি নষ্ট হয়ে গেছে কেন? রঘুনাথপুরে না দিয়ে নদীয়ার হরিণঘাটার খামারের ১০০একর জমি ফ্লিপকার্টকে দেওয়া হয়েছে কেন? ফসল বীমার প্রিমিয়াম জমা না দিয়ে সরকার ক্লাবগুলোকে টাকা বিলিয়েছে কেন? কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদীও কৃষকের স্বার্থ দেখছেন না, ইনিও দেখছেন না। 

তুষার ঘোষ বলেছেন, বামফ্রন্ট সরকার যখন পরিকল্পিত নগরায়ণের জন্য রাজারহাটের নিউটাউন গড়ে তুলেছিলো তখন বিরোধীনেত্রী থাকাকালীন মমতা ব্যানার্জি বলেছিলেন, ‘জমি ফেরৎ দেবো’। এখন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে তিনি রাজারহাটের নিউটাউনেই সরকারি উৎসব অনুষ্ঠান করছেন। ওঁর সব কিছুতেই দ্বিচারিতা। শিল্প বা কৃষি কোনটারই পক্ষে উনি নন। 

সিঙ্গুরের ফেরৎ দেওয়া জমিতে চাষ নিয়ে সরকারি বক্তব্যকেও অসত্য বলে অভিযোগ করেছেন কৃষক নেতৃবৃন্দ। অমল হালদার বলেছেন, ৯৯৭একরের মধ্যে মাত্র ১১একর জমিতে চাষ হচ্ছে। বাকিটা কার্যত শ্মশানে পরিণত হয়েছে। কৃষকরা দুর্দশায় রয়েছেন, তাঁরা চাইছেন সিঙ্গুরে শিল্প হোক। সারা রাজ্যেই বেকার যুবকরা কাজের আশায় রাজ্য ছেড়ে ভিনরাজ্যে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। কৃষিকাজের খরচ এত বেড়েছে যে কৃষকরা ধান, পাট, আলু, সবজি সবেরই অভাবী বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। সরকার কোন ব্যবস্থাই নিচ্ছে না। ঋণভারে ১৮৭জন কৃষক আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন। এই অবস্থায় বাধ্য হয়ে আমরা সিঙ্গুর থেকে রাজভবন অভিযানের কর্মসূচী নিয়েছি। এই কর্মসূচীর প্রচারের জন্য সভা মিছিল ইত্যাদিও করা হয়েছে। সিঙ্গুর থেকে রাজভবন অভিযানের প্রভাব সমাজের সর্বস্তরেই পড়বে বলে আমাদের বিশ্বাস। 

নেতৃবৃন্দ জানান, সিঙ্গুর থেকে রাজভবন পদযাত্রায় দাবি উঠবে, সিঙ্গুর-সহ রাজ্যের সর্বত্র শিল্পের জন্য অধিগৃহীত জমিতে শিল্পস্থাপন করতে হবে। কৃষক খেতমজুর পরিবার-সহ সব বেকারের কাজ চাই। কৃষক খেতমজুর ও বর্গাদারদের সরকারি  সহযোগিতার ক্ষেত্রে বিভেদের নীতি বন্ধ করতে হবে। স্বামীনাথন কমিশনের সুপারিশ অনুসারে কৃষকদের সব ফসলের উৎপাদন খরচের দেড়গুণ দাম দিতে হবে। কৃষিঋণ মকুব করতে হবে। রেগা প্রকল্পে বছরে ২০০দিন কাজ ও ৩৫০টাকা করে মজুরি দিতে হবে। ৬০বছরের উর্ধ্বে কৃষক খেতমজুর-সহ সব গরিবদের মাসে ন্যূনতম ৬হাজার টাকা পেনশন দিতে হবে। কেন্দ্র এবং রাজ্যে সমস্ত দুর্নীতিগ্রস্তের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। সাম্প্রদায়িকতা ও জাতি বিভাজন বন্ধ করতে হবে। 

Post a Comment

0 Comments