নবান্নকে যেতে হবে গ্রামে, জানিয়ে গেল কৃষকদের লঙ মার্চ।

৫২কিমি পথ পার করে এদিন রানি রাসমণি রোডে এসে থামে লঙ মার্চ। গোটা রাজপথের দখলে অন্নদাতারা। রাজভবনের সামনে জড়ো হওয়া কৃষকদের কাছে সিপিআই(এম)র রাজ্য সম্পাদক সূর্য মিশ্রের আহ্বান, লড়াই শুরু। এই লড়াই নিয়ে যেতে গ্রামে। বুথে। পাড়ায়। পঞ্চায়েতে। জেলায়। সব জায়গায় বিছিয়ে দিতে হবে লড়াইকে। আপনারা সিঙ্গুর থেকে রাজভবন হেঁটে এসেছেন। এমন আন্দোলন গড়ে তুলুন যাতে রাজভবন, নবান্নকে ছুটতে হয় আপনাদের গ্রামে।


মিছিল আসছে রবীন্দ্র সেতু দিয়ে। নিচে বহমান গঙ্গা। সেতুতে লাল জনস্রোত। মিছিল দেখে গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট, ৩০হাজার পার করে মিছিল ঢুকছে। আরও মিছিল আসছে শিয়ালদহ থেকে। সেখানেও আরও, আরও অগণিত মানুষ। বার্তা চালাচালি করছে গোয়েন্দারা।

দুই প্রান্ত দিয়ে আসা জনস্রোত মিশেছে তিন লেনের রাসমণিতে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার দিল্লিতে পাঠানো রিপোর্ট বলছে, ৪০হাজার ছাড়িয়ে গেছে কলকাতার কৃষক সমাবেশ।

কৃষক অভিযান নিয়ে আগ্রহ শুধু গোয়েন্দাদের ছিল না। তুমুল আগ্রহ ছিলো জাতীয় মিডিয়ারও। সকাল থেকে ফোন, দিল্লি, রাজস্থান, ইউ পি থেকে। সবাই চাইছে কলকাতার কৃষক লঙ মার্চের ফুটেজ। ফোন করে শুধু জানতে চাইছে, দাদা কব ঘুসেগা আপকা কৃষক লঙ মার্চ কলকাত্তামে। রাসমণি রোডে বলছিলেন সর্বভারতীয় বৈদ্যুতিন সংবাদমাধ্যমের সহকর্মী সাংবাদিক বন্ধু।

সেই মিছিল ঢুকলো রানি রাসমণিতে। ১টা ৪৭মিনিটে। লাল পতাকার জনজোয়ারে ভেসে গেল তিন লেনের রাস্তা। হাওড়া থেকে মূল পদযাত্রীরা তখন দূরে। মাইক ধরে নৃপেন চৌধুরি বলছেন, বিশাল, বিশাল মিছিল আসছে। যে যেখানে পারেন বসে পড়েন। এখনও বিশাল মিছিল আসছে। আপনারা না বসলে তারা যে কিছুই দেখতে পাবে না।

জনতা বসলো কী বসলো না, আবার এক ঢেউ। বাধাভাঙা ঢেউ আছড়ে পড়ল ডোরিনা ক্রসিং-এ। লাল পতাকা নিয়ে এবার আসছে সিঙ্গুরের লঙ মার্চ।

দরিয়ার ডাকে দিল সাড়া মহাভারতের জনতা/ উত্তাল ঢেউয়ে, ঢেউয়ে কল্লোলিত মহানগর কলকাতা। নাটকের শুরুতে এমনই ছিল গানের কথা। ১৯৬৫সালে প্রথম অভিনীত নাটক পি এল টি-র কল্লোল। তিলোত্তমায় সাড়া ফেলা সেই নাটকের গানের মতোই এদিনও যেন উত্তাল কৃষকের ঢেউয়ে কল্লোলিত হয়েছে নগর কলকাতা।

কৃষক খেতমজুররের দাবিতে কল্লোলিত ছিল নগর কলকাতা। মুখরিত সেই মহাভারতের জনতার সামনেই সারা ভারত খেতমজুর ইউনিয়নের রাজ্য সভাপতি তুষার ঘোষ বললেন, এ মিছিল সবে শুরু। সংগ্রাম সবে শুরু হয়েছে। ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে সংগ্রাম হবে। উত্তর ২৪ ২৪পরগনায় ফুলকপির দাম কৃষক পাচ্ছে এক টাকা। আর মোদী করছে রাম নাম। আর মমতা করছে দুর্গানাম। কৃষকের নাম, খেতমজুরের নাম কেউ করে না। এসব আর চলবে না।

চলার কথাও নয়। যারা অন্নের সংস্থান করছে তারাই কি না আজ আধপেটা খাচ্ছে। দেনার দায়ে আত্মঘাতী হচ্ছে। সেই তাদের কথা বলতে গিয়ে আটকে যাচ্ছিল গলার স্বর। সমাবেশকে সাক্ষী রেখে আত্মঘাতী এক কৃষকের স্ত্রীর কথা বলছিলেন সারা ভারত কৃষকসভার রাজ্য সম্পাদক অমল হালদার।  রাতে খাওয়ার সময় বলেছিলাম, আমার সবকটা গয়না বন্ধক দিয়ে দিলে। গয়নাগুলো আর তো ছাড়াতে পারলে না। খাওয়ার সময় মুখের দিকে একবার তাকিয়ে নামিয়ে রেখেছিল। ভাবলাম, খাওয়ার সময় না বললেই ভালো হতো। সারা রাত চোখে চোখে রেখেছিলাম। ভোরের দিকে চোখটা একটু টেনে এসছিলো। তার মধ্যে উঠে গিয়ে বিষ খেয়ে নেয়। ছটফট করতে বলেছিল, ছেলে দুটোকে দেখিস। আমি তো চললাম। তোমার গয়না আর ছাড়াতে পারলাম না। আত্মঘাতী কৃষক পরিবারের অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন অমল হালদার। সেই কৃষকদের আত্মহত্যা নিয়ে পরিহাস করছে নবান্ন। এবার তাই আত্মঘাতী কৃষক পরিবারকে কলকাতায় এনে সমাবেশ করবে কৃষকসভা জানিয়ে অমল হালদার বলেছেন, ১০লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ চাই আত্মঘাতী পরিবারের।

কৃষক আত্মহত্যা করছে। ঋণজালে জড়িয়ে পড়ছে। দাম পাচ্ছে না ফসলের। কাজ নেই খেতমজুরের। বাঁচবে কী নিয়ে মানুষ?

বাঁচার কথাই এদিন শুনেছে লঙ মার্চ। কলকাতায় এসে যেমন জানিয়ে গেছে নিজের দাবি। তেমনই আগামী দিনে পথ খুঁজেছে বাংলার কৃষক।

সেই পথের হদিশ দিয়ে কৃষক খেতমজুরদের সূর্য মিশ্র বলেছেন, ধান উঠবে কিছুদিন পর থেকে। দর না পেলে, যেখানে পারবেন বিডিও, এস ডি ও, পঞ্চায়েত, ব্লকে বসে পড়বেন। ফসলের দাম আমাদের চাইই। ছাড়বেন না। এমন বসবেন, দাবি না মেটা পর্যন্ত উঠবেন না। ১০০দিনের কাজ পাওয়া আইনগত অধিকার। কাজ না দিলে বসিয়ে পয়সা দেবে। যদি না দেয় ৪ক আবেদন নিয়ে যান। কাজ পাচ্ছি না বলে দরখাস্ত করুন। এটা আদায় না করে ছাড়বেন না। এমনভাবে জোট বেঁধে পঞ্চায়েতে ঢুকবেন যাতে ওরা অফিস ছেড়ে পালিয়ে যায়। কাজ চাই, আমাদের কাজ চাই। কাজের জন্য দাবি আদায়ের আন্দোলন গড়ে তুলুন।

কাজ চাই খেতমজুরদের। মাঠের কাজ কাড়ছে মেশিন। ১০০দিনের কাজ নেই। কোথায় যাবে খেতমজুরের ঘরের ছেলে? ‘৪০লক্ষ বেকার ছেলে খেটে খাওয়ার জন্য রাজ্যের বাইরে। সেখানে কী তারা নিশ্চিন্তে থাকতে পারবে? বিজেপি শাসিত গুজরাটে, আসামে কী ঘটছে? অভিভাবকরা নিশ্চিন্তে থাকতে পারছে না। বলছিলেন সারা ভারত খেতমজুর ইউনিয়নের রাজ্য সম্পাদক অমিয় পাত্র।

আন্দোলনের এই সময়াকালেই আসবে ৬ই ডিসেম্বর। দিনটির কথা এদিন কৃষক খেতমজুরকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে সূর্য মিশ্র বলেছেন, বিজেপি আর এস এস এখন বলছে, তারা সুপ্রিম কোর্ট মানবে না। ওরা দাঙ্গা চায়। তাই মেহনতি মানুষের ঐক্যকে রক্ষা করার জন্য আমাদেরই সতর্ক থাকতে হবে।

কলাকাতা থেকে এদিন ফিরে গেছে কৃষক। তবে লড়াই যে চলবে তার দিনলিপি শুনে গেছে তারা।

শ্রমিকের সঙ্গে জোট বেঁধে লড়াই হবে আগামী জানুয়ারিতে। ৪৮ঘণ্টার ধর্মঘটে স্তব্ধ হবে দেশ। ৮-৯ই জানুয়ারি সেই ধর্মঘটের প্রস্তুতি নেবে কৃষক খেতমজুর। তারপর?

ফের ৩রা ফেব্রুয়ারি। তিলোত্তমাকে ভাসাতে আবার ব্রিগেডের পা মেলাবে বাংলার অন্নদাতারা।

Post a Comment

0 Comments