‘আমরা দশ দিন সময় চেয়েছিলাম, দু’দিনে করে দিয়েছি’

মধ্যপ্রদেশ, ছত্তীসগঢ়ের পরে রাজস্থান। সদ্য জেতা হিন্দি বলয়ের তৃতীয় রাজ্যেও কৃষিঋণ মকুব করে দিল কংগ্রেস। সে রাজ্যের চাষিদের ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ শুধতে হবে না। সে জন্য সরকারের খরচ হবে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা। প্রাথমিক হিসেব অনুযায়ী মধ্যপ্রদেশ সরকারের উপরে কৃষিঋণ মকুবের বোঝা চাপবে ৩৫ থেকে ৩৮ হাজার কোটি টাকা। আর ছত্তীসগঢ়ের ক্ষেত্রে দায়ের পরিমাণ ৬ হাজার কোটি টাকা। ছত্তীসগঢ়ের ঘোষণার পরে রাতে কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধীর টুইট: ‘আমরা দশ দিন সময় চেয়েছিলাম। দু’দিনে করে দিয়েছি।’


কৃষিঋণ মকুব নিয়ে আজ রাহুলের নাম না-করে কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির কটাক্ষ: ‘স্লোগান’-এর সঙ্গে যথেষ্ট অর্থ ও নীতিও প্রয়োজন। না হলে মানুষ ফাঁপা প্রতিশ্রুতি খুব তাড়াতাড়ি ধরে ফেলেন। অর্থনীতিবিদ ও কৃষি বিশেষজ্ঞদেরও যুক্তি, ঋণ মাফে গরিব চাষিদের লাভ হবে না। উল্টে অর্থনীতিরই ক্ষতি হবে। কিন্তু ঘটনা হল, কংগ্রেসের সঙ্গে পাল্লা দিতে নরেন্দ্র মোদীর নিজের রাজ্য গুজরাত ৬৫০ কোটি টাকার গ্রামীণ বিদ্যুৎ বিল মকুব করেছে। অসমের বিজেপি সরকার কৃষিঋণের একাংশ মাফ করে ৬০০ কোটি টাকার দায় নিয়েছে।




এর সাফল্য দাবি করে কংগ্রেস সভাপতি আজ দুপুরে টুইট করেন, ‘গভীর নিদ্রায় থাকা অসম ও গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রীদের ঘুম কংগ্রেস ভাঙাতে পেরেছে। প্রধানমন্ত্রী এখনও ঘুমোচ্ছেন। আমরা ওঁকেও ঘুম থেকে তুলব।’ হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্যে কৃষিঋণ মকুবের প্রতিশ্রুতি দিয়েই সাফল্য পেয়েছে কংগ্রেস। তাতে ভর করেই মঙ্গলবার রাহুল ঘোষণা করে দেন, মোদী সরকার না-করলে, ২০১৯-এ ক্ষমতায় এলে তাঁরা গোটা দেশের চাষিদের ঋণ মকুব করবেন।

কিন্তু অর্থনীতিবিদেরা বলছেন, দেশের চার ভাগের তিন ভাগ চাষিই ব্যাঙ্ক থেকে ঋণ পান না। ফলে লাভের গুড় খেয়ে যাবেন ধনী চাষিরা। অথচ খয়রাতিতে টাকা ঢালতে গিয়ে রাজ্যগুলির হাতে পরিকাঠামো তৈরিতে খরচ করার অর্থ থাকবে না। অর্থনীতিবিদ অরবিন্দ পানাগড়িয়ার যুক্তি, ‘‘নিচুর দিকে দৌড়নোর দুঃখজনক প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। ঋণ মকুবে চাষিদের দুর্দশা কেটে গেলে স্বাগত জানানো যেত। কিন্তু স্বাধীনতার ৭০ বছর পরেও চাষিরা দুর্দশার মধ্যে থাকলে অন্য সমাধান ভাবা জরুরি।’’ প্রবীণ কৃষি অর্থনীতিবিদ এম এস স্বামীনাথনও বলেছিলেন, ঋণ মকুব কোনও স্থায়ী সমাধান নয়।আতঙ্ক ছড়িয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কে কর্তাদের মধ্যে। তাঁদের যুক্তি, এক বার ঋণ মকুব করে দিলে তার পরে চাষিরা আর ঋণ শোধ করতে পারেন না। ২০০৯-এ প্রথম ইউপিএ-সরকারের ঋণ মকুব হোক বা গত বছর উত্তরপ্রদেশে মুখ্যমন্ত্রীর গদিতে বসার পর যোগী আদিত্যনাথের ঋণ মাফ, প্রতিবারই দেখা গিয়েছে, ঋণ মাফের পরে শোধ না-হওয়া কৃষিঋণের পরিমাণ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে।




স্টেট ব্যাঙ্কের প্রাক্তন চেয়ারপার্সন অরুন্ধতী ভট্টাচার্য আগেই বলেছিলেন, ‘‘এক বার ঋণ মাফ হয়ে গেলে পরের বারের ঋণও মাফ হয়ে যাবে বলে আশা তৈরি হয়। ফলে পরের ঋণ শোধ হয় না।’’

রাহুলের সাফল্যের দাবি নিয়ে খোঁচা দিয়েছেন নীতি আয়োগের উপাধ্যক্ষ রাজীব কুমার। তাঁর কটাক্ষ, ‘‘এ হল কেউ মানুক বা না মানুক, আমিই চ্যাম্পিয়ন।’’ তাঁর দাবি, ‘‘ঋণ মকুব কোনও সমাধান নয়। ক্ষতে প্রলেপ মাত্র।’’

কংগ্রেসের নেতাদের পাল্টা যুক্তি, নরেন্দ্র মোদীর নীতি আয়োগ এখন বলছে, ঋণ মকুব করে কোনও লাভ হয় না। তা হলে যোগী আদিত্যনাথ ঋণ মকুব করেছিলেন কেন? গত এক বছরে মহারাষ্ট্র, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থানের বিজেপি সরকার ঋণ মকুব করেছে কেন? কেনই বা অসমের বিজেপি সরকার ঋণ মকুব করছে?

বাস্তব হল, লোকসভা ভোটের সেমিফাইনাল— পাঁচ রাজ্যের বিধানসভা ভোটে ব্যর্থতার পর মোদী সরকারও নতুন করে কৃষিঋণ মকুব করা নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করেছে। কিন্তু জেটলির হাত-পা বাঁধা। গোটা দেশের চাষিদের ঋণ মকুব করতে গেলে অন্তত ৪ থেকে ৫ লক্ষ কোটি টাকার ধাক্কা বলে অর্থ মন্ত্রকের কর্তাদের অনুমান। জেটলির পক্ষে সেই টাকা জোগাড় করা মুশকিল। এ দিকে কৃষক সংগঠনের নেতারা স্পষ্ট বলেছেন, যাঁরা কৃষিঋণ মকুবের দাবি মানবেন, ভোট তাঁদের দিকেই যাবে।

Post a Comment

0 Comments