‘প্রমাণ করেই ছাড়ব চৌকিদার চোর!’, রাহুলের

সকালে রাফাল নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের রায় বেরোনোর পরেই হইহই করে রাহুল গাঁধী তথা কংগ্রেসকে নিশানা করে আসরে নেমে পড়েছিলেন নরেন্দ্র মোদীর সেনাপতিরা। সন্ধ্যা হতেই খেলা ঘুরিয়ে দিলেন রাহুল গাঁধী। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ‘গলদ’ তুলে ধরে উল্টে চাপে ফেললেন মোদী ও তাঁর সঙ্গীদেরই। যার কোনও জুতসই জবাব দিতে পারলেন না মোদী-সঙ্গীরা বা তাঁর সরকারের সদস্যেরা।

সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি রঞ্জন গগৈ, বিচারপতি কে এম জোসেফ এবং বিচারপতি এস কে কউলের বেঞ্চের সর্বসম্মত রায়ের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাফালের দাম সবিস্তার জানানো হয়েছে কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি)কে। আর সিএজি-র রিপোর্ট খতিয়ে দেখেছে সংসদের পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি (পিএসি)। সন্ধ্যায় সাংবাদিক সম্মেলনে পিএসি-র  চেয়ারম্যান তথা কংগ্রেস নেতা মল্লিকার্জুন খড়্গেকে সঙ্গে এনে রাহুল বলেন, ‘‘গোটা রায়ের ভিতটাই এটা। কিন্তু বাস্তব হল, রাফালের দামের বিষয়টি পিএসি-র কাছে আসেইনি।’’ খড়্গেও বলেন, ‘‘আজই পিএসি-র বৈঠক ছিল। ডেপুটি সিএজি-কেও প্রশ্ন করি, এমন কোনও রিপোর্ট আছে কি না? না কি আমার সই কেউ জাল করলেন? রিপোর্ট সিএজি-র কাছেও নেই, পিএসি-র কাছেও নেই। আর সংসদে যত ক্ষণ না রিপোর্ট জমা পড়ছে, সেটি অন্য কাউকে জানানোর অধিকারও নেই।’’ এর পরেই রাহুল বলেন, ‘‘এই রিপোর্ট কোথা থেকে এসেছে?’’

সিএজি-র এই অংশটি নিয়েই চাপ বাড়াচ্ছেন রাহুল। এ দিন সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি আটঘাট বেঁধেই এসেছিলেন। সঙ্গে এনেছিলেন পি চিদম্বরম, গুলাম নবি আজাদ, আহমেদ পটেলকে। কংগ্রেস নেতাদের বক্তব্য, যে রিপোর্টের অস্তিত্বই নেই, সেটি সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এল কী করে? এ তো জালিয়াতি! এর বিরুদ্ধে সংসদে স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিস আনতে পারেন কংগ্রেস নেতারা। সরকার হয়ত ভেবেছিল, এই রায় আসার আগে সিএজি-র রিপোর্ট চলে আসবে। কিন্তু আসেনি। আর এতেই ফেঁসে গিয়েছে মোদী সরকার। বিষয়টা যে অস্বস্তির কারণ, তা ঘরোয়া মহলে মানছেন সরকারের কয়েক জন কর্তাও। রাতে সরকারের একটি সূত্রে বলা হয়, আদালতকে বলা হয়েছিল বিষয়টি সিএজি দেখছে, পিএসি দেখবে। রায়ে সিএজি-পিএসি অংশটা আদালতে টাইপ করতে গিয়ে ভুল হয়েছে। এটা সংশোধনের জন্য সোমবার সুপ্রিম কোর্টে যাবে সরকার।

কিন্তু এমন যুক্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ। তিনি বলেন, এমন কথা সরকার আদালতকে অন-রেকর্ড বলেনি। তা হলে বললটা কখন? কংগ্রেস নেতারা ঘরোয়া মহলে প্রশ্ন তুলছেন, সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিলেন ঘুরে দেখতে। এ’টি তার পরিণাম নয় তো? সরকারকে এক ইঞ্চিও জমি ছাড়তে নারাজ রাহুল বলেন, ‘‘যখন কেউ মিথ্যা বলেন, কোনও না কোনও ছাপ রেখে যান। সরকার দেখাক, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে উল্লেখ করা রিপোর্টটি কোথায়? না কি মোদী প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ে আরও একটি পিএসি বসিয়ে রেখেছেন? হতেও পারে! সব প্রতিষ্ঠানের তো ‘অ্যাইসি কি ত্যাইসি’ করে ফেলেছেন!’’ সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরে বিজেপি নেতারা ভেবেছিলেন, এ বারে রণে ভঙ্গ দেবেন কংগ্রেস সভাপতি। কিন্তু রাহুল উল্টে আরও সুর চড়ান, ‘‘কৃষকদের টাকা নিয়েছে এই চোরেরা। গোটা ভারত বোঝে চৌকিদার চোর। প্রমাণ করে ছাড়ব, ভারতের প্রধানমন্ত্রী অনিল অম্বানীর বন্ধু। আর তাঁকে দিয়ে চুরি করিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।’’

সরাসরি মোদীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে রাহুল বলেন, ‘‘মোদীজি যত পালানোর আর লুকনোর চেষ্টা করুন, পারবেন না। যৌথ সংসদীয় কমিটির তদন্ত হলেই দু’জনের নাম বেরোবে— নরেন্দ্র মোদী আর অনিল অম্বানী।’’ সুপ্রিম কোর্টের রায়কে হাতিয়ার করে রাহুলকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে অমিত শাহ, অরুণ জেটলি, নির্মলা সীতারামনরা আসরে নেমেছিলেন। কিন্তু রাহুলের উগ্রমূর্তি দেখে রাতে সাংবাদিক সম্মেলন করলেন আইনমন্ত্রী রবিশঙ্কর প্রসাদ। তিনি বললেন, ‘‘রাহুল গাঁধীর ভাষা, শরীরের ভঙ্গিমা নিম্নস্তরের। আজ সব সীমা লঙ্ঘন করে সুপ্রিম কোর্টের বিরুদ্ধেও মন্তব্য করলেন! তিনি কি সুপ্রিম কোর্টেরও ঊর্ধ্বে?’’

সিএজি রিপোর্ট নিয়ে রাহুলের অভিযোগের জবাব এড়িয়ে রবিশঙ্কর বলেন, ‘‘রাহুল খুঁটিনাটিতে যাচ্ছেন। আমি পুরো রায়ের ব্যাপারে বলছি। এটি তো মাত্র একটি লাইন। রাহুল পুরো রায় পড়ুন না।’’ যা শুনে কংগ্রেসের এক নেতা বললেন, ‘‘ফেঁসে গিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। এ বারে সংসদে এই নিয়ে হল্লা হবে।’’ কংগ্রেস সূত্রে বলা হচ্ছে, সিএজি-পিএসি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টকে বিভ্রান্ত করেছে সরকার। সেটা নিয়েই আগামী দিনে চাপ বাড়াবে কংগ্রেস।

Post a Comment

0 Comments