এনআরসি আতঙ্কে ভুগছে বাংলা,নথিপত্র সংগ্রহে কলকাতায় উন্মাদনা

এক নতুন আতঙ্কে ভুগছে রাজ্য, তার নাম এনআরসি আতঙ্ক। জাতীয় নাগরিক নিবন্ধীকরণ অর্থাৎ এনআরসি (NRC) নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ জুড়েই ছড়িয়ে পড়েছে চরম ভয়। রাজ্যের (West Bengal) উত্তরাঞ্চলে সাম্প্রতিক ৩-৪টি আত্মহত্যার ঘটনায় মৃতদের পরিবারগুলি দায়ী করছে এই এনআরসি আতঙ্ককেই। সেই আতঙ্কের হাওয়া এখন এসে পৌঁছেছে শহর কলকাতাতেও। এনআরসি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও বিজেপির মধ্যে বাগযুদ্ধের মধ্যেই মানুষ চাইছেন নিজের নথিপত্র ঠিক করে রাখতে। আর যাঁদের সেইভাবে নাগরিকত্ব বিষয়ে বৈধ নথিপত্র এখনও নেই তাঁরা চাইছেন তা সংগ্রহ করতে। ফলে নতুন নথিপত্র সংগ্রহ করতে বা পুরানোগুলির ভুল সংশোধন করতে কলকাতা পৌর কর্পোরেশনে ছুটে আসছেন অসংখ্য মানুষ।

মুন্সি মুসারাফ হোসেন ও তাঁর স্ত্রী রেশমা বেগম মুর্শিদাবাদ জেলার সালার থেকে ২০০ কিলোমিটার দূরত্ব পেরিয়ে কলকাতা পৌর কর্পোরেশনে ছুটে গিয়েছিলেন তাঁদের দু'জন কলেজে-পড়া সন্তানের জন্মের শংসাপত্র সুরক্ষিত করতে। কলকাতার একটি সরকারি হাসপাতালে জন্মগ্রহণ করা, দুজনেরই এখনও পর্যন্ত জন্মের প্রমাণপত্র হিসাবে হাসপাতালের ডিসচার্জ সার্টিফিকেটই ব্যবহার করা হচ্ছিল। তবে আর নয়, এনআরসি খাঁড়া মাথায় ঝুলিয়ে রাখতে চান না তাঁরা।

রেশমা বেগম বলেন, "এনআরসির ভয়ে আমরা আমাদের বাচ্চাদের জন্মের শংসাপত্র সংগ্রহের জন্যে এখানে এসেছি। আমি আশঙ্কা করছি যে এনআরসি চালু হলে ওঁরা আমাদের দেশের বাইরে পাঠিয়ে দেবে।" তাঁর স্বামী হোসেনও ঠিক তেমনই হতবাক হয়েছিলেন। "রাজনীতিবিদরা আমাদের সঙ্গে খেলা করছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন এ রাজ্যে এনআরসি চালু হতে দেব না, কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট যদি আদেশ দেয় তবে আমাদের কাগজপত্র দেখাতেই হবে। সুতরাং আমাদের অবশ্যই প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রস্তুত রাখতে হবে।"

এই একই এনআরসি ভয় তাড়া করে বেড়াচ্ছে আরও অনেককেই। কলকাতার এক কলেজ ছাত্র মেহের আলী নিজের জন্মের শংসাপত্রে বাবার নামের বানানটি সংশোধন করার জন্য হাজির হয়েছিলেন। এদিকে দুই ছোট বাচ্চার মা সাবাহত পারভীন নিজের বাচ্চাদের নতুন জন্মের শংসাপত্র পাওয়ার অপেক্ষায় ভোর ৩টে থেকে কলকাতা পৌর কর্পোরেশনের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। এনআরসি আতঙ্কে তিনি তাঁর বাচ্চাদের আগের জন্ম শংসাপত্রগুলি খুঁজে পাচ্ছেন না, তাই আবার তা সংগ্রহ করতেই লাইন দেন।

"আমি আমার বাচ্চাদের জন্যেই এসেছি। সরকার বলেছে যে আমাদের কাছে কাগজপত্র না থাকলে আমাদের দেশ ছেড়ে যেতে হবে বা শরনার্থী শিবিরে বন্দি থাকতে হবে। আমি আমার বাচ্চাদের এই দুর্ভোগের হাত থেকে বাঁচাতে চাই" বলেন পারভিন ।

মেহের আলি দাবি করেন যে বাংলায় এখনও এনআরসি চালুর করা ঘোষণা না হলেও চান্স নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তিনি বলেন, "আমাদের কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা উচিত। কখন কী হতে পারে তা আপনি কখনই জানেন না। কেউ বলতে পারে না। হিন্দু, মুসলমান, শিখ, সকলেই আতঙ্কিত" ।

ইতিমধ্যেই কিছু খবরে গত সপ্তাহে উত্তরবঙ্গে ছয়জনের আত্মহত্যার জন্যে এনআরসি-সম্পর্কিত ভয়কেই দায়ী করা হয়েছে। এনআরসি ইস্যু নিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপির মধ্যে মৌখিক দ্বন্দ্ব চলছেই। ১ অক্টোবর কলকাতার নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামে এক জনসভায় অমিত শাহ এনআরসি নিয়ে এক বিতর্কে যোগ দিতে রাজ্যে আসছেন

"কিছু মানুষ আশঙ্কা করছেন, এনআরসি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তাঁদের একাত্তরের শংসাপত্রের দরকার হবে। এ রাজ্যে কোনও এনআরসি চালু হবে না। সুতরাং এনআরসি নিয়ে চিন্তা করবেন না," পশ্চিম মেদিনীপুরের এক সভায় বলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর ওই আশ্বাসের ২৪ ঘণ্টা পেরোতে না পেরোতেই বিজেপি নেতা কৈলাশ বিজয়বর্গীয় বলেন: "বাংলায় একশো শতাংশ এনআরসি চালু হবে। বিজেপি এখানে ক্ষমতায় আসার পরে অনুপ্রবেশকারীদের এ দেশে থাকতে দেওয়া হবে না। তবে হ্যাঁ, হিন্দুরা দেশেই থাকবেন। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল খুব তাড়াতাড়ি আসবে।"

কলকাতা পৌর কর্পোরেশনের কিছু আধিকারিক বলেন যে ভিড়ের পরিমাণ স্বাভাবিক ছিল, কিন্তু অন্যরা ঠিক উল্টো দাবি করেন। "অফিসে মানুষের এক দীর্ঘ লাইন হওয়ার অন্য কোনও কারণ নেই কেননা এখন বিদ্যালয়ে ভর্তির মরশুম নয়। আমার পুরো কেরিয়ারে, আমি একই সঙ্গে জন্মের শংসাপত্রের জন্য আবেদন করতে এত বিশাল ভিড় দেখিনি ... লোকেরা বলছে এনআরসি আতঙ্কের জেরেই এই ঘটনা, তবে আমরা নন-স্টপ কাজ করছি", জন্মের শংসাপত্র ইস্যু করার কাউন্টারে বসে থাকা আধিকারিক স্বপন ঘোষ বলেন এ কথা।

Post a Comment

0 Comments